শরণার্থী শিবিরের জলকাদায় মার্কিন সিনেটর কেনেডি
লেখক: অজয় দাশগুপ্ত
১৯৭১ সালের ১০ আগস্ট ভারত সফরে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি। তিনি পাকিস্তানেও যেতে চেয়েছিলে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার ভিসা বাতিল করে দেন। এর মাসখানেক আগে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ভারত সফরে এসেছিলেন। তিনি ভারতের রাজনীতিক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই পাকিস্তানের পথে পা বাড়ান। অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি চলে যান পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। লাখ লাখ শরণার্থী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস হামলার মুখে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসেছেন। তাদের অনেকে নিকটজন হারিয়েছেন।
দি ব্লাড টেলিগ্রাম: ইন্ডিয়াস সিক্রেট ওয়ার ইন ইস্ট পাকিস্তান গ্রন্থে গ্যারি জে বাস লিখেছেন, উন্নয়ন ও উদ্বাস্তু ত্রাণবিষয়ক আমেরিকান বিশেষজ্ঞ নেভিন স্ক্রিমশ ছিলেন কেনেডির সফরসঙ্গী। তিনি এমআইটির পুষ্টিবিষয়ক অধ্যাপক ছিলেন।
তাদের প্রথম সফর ছিল কলকাতার কাছের একটি শরণার্থী শিবিরে। হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু এখানে রয়েছে। স্ক্রিমশ লিখেছেন, আমাদের তাঁবুতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। গোটা পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন। স্যানিটেশন বলতে কিছু নেই। একটি তাঁবুতে একটি শিশুর দেখা পাই, যার আয়ু হয়তো আর কয়েক ঘন্টা।
একটি বড় মাঠের মতো স্থানকে ল্যাট্রিন হিসেবে ব্যবহারের জন্য পৃথক করে রাখা হয়েছে। সেখানে অনেক মানুষের দীর্ঘ লাইন। বেশিরভাগ আক্রান্ত ডায়রিয়ায়। তখন বর্ষার সময়। ল্যাট্রিনের মলমূত্র বর্ষার পানিতে মিশে একাকার। কাদামাটি আর মলমূত্র মাড়িয়েই লোকজন খালি পায়ে চলাচল করছে এবং বসবাস ও খাবার স্থানে যাচ্ছে। জরাজীর্ণ তাঁবুর ভেতরে পড়ছে বৃষ্টির পানি। অনেকে কাঁদছে। বিশেষ করে অপুষ্টির শিকার শিশুদের কান্না সহ্য করা যায় না। অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, সেটা ভাবতেও পারেননি।
অন্যদের মতো কেনেডিও বৃষ্টিতে ভেজেন। তিনি এক পর্যায়ে পোশাক পরিবর্তন করতে বাধ্য হন, তবে এ জন্য খুব অনুতাপ করেছেন। এক পর্যায়ে তার নিরাপত্তায় নিযুক্ত ভারতীয় সৈনিকদের রেখেই তিনি এগিয়ে যান শরণার্থীদের মধ্যে। তখন তিনি দুই ফুট পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে। কোনো গর্তে পড়ে গেলে কী করতে হবে, সেটা তার জানা নেই। তিনি গভীর মমতা ও আন্তরিকতা নিয়েই শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
ত্রিপুরার কয়েকটি ক্যাম্পে তিনি পুরো দিন কাটান। সবাই যখন ধরে নিয়েছেন যে, আজকের মতো কষ্টের সময় শেষ, তখন রাত সাড়ে ১০টায় তিনি বলেন, আরেকটি শিবির দেখতে যাব। সেখান থেকে শিশুদের একটি হাসপাতালে। পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তের যতটা কাছে সম্ভব, তিনি চলে গিয়েছিলেন। তিনি একদল শরণার্থীকে নদী অতিক্রম করে ভারতে আসতে দেখেন।
পশ্চিমবঙ্গের বারাসাত ও কল্যাণী শরণার্থী শিবিরে তিনি শত শত শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিও ছিলেন। ৫৫ বছরের এক মুসলিম রেলওয়ে কর্মী বলেন, আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। রেলে কেরানির কাজ করি। তারা কেন আমাকে টার্গেট করেছিল জানি না। ত্রিপুরার হাসপাতালে তিনি গুলিবিদ্ধ এক শিশুকে দেখেছেন। রাতে এক নারীর সঙ্গে কথা বলেন, তাকেও পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি করেছিল। তিনি ও তার সফরসঙ্গীরা শত শত আহত লোকের দেখা পান।
অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি একটি প্রসঙ্গ কোথাও উল্লেখ করতে চাননি যে. তিনি মুক্তিবাহিনীর কয়েকজন সদস্যের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তারা যুদ্ধাহত ছিলেন। তিনি শুনেছেন কীভাবে ঠান্ডা মাথায় বাংলাদেশে গণহত্যা পরিচালনা করা হচ্ছে। শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শনকালে তিনি মৃতদের সৎকার ও দাফনের সমস্যার কথা জেনে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। সর্বত্র ডায়রিয়া ও সর্দি-জ্বর-শ্বাসকষ্টের রোগী। একের পর এক অপুষ্টির শিকার শিশু তার চোখের সামনে। একটি শিশুকে দেখেন, যে অন্ধ হতে চলেছে। তাকে ভিটামিন ইন্জেকশন দেওয়া গেলে এ করুণ পরিণতি হতো না।
ক্রিমশ লিখেছেন, গোটা পশ্চিমবঙ্গই যে শরণার্থী শিবির। এক শিবিরের পরিচালককে তিনি জিজ্ঞেস করেন, এখন সবচেয়ে জরুরি কী প্রয়োজন? উত্তর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments